কয়রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত উপকূলের একমাত্র আশ্রয়স্থল

সাইফুল ইসলাম, কয়রা

কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের চারদিকে যেন প্রকৃতির হাহাকার। নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস আর ঘূর্ণিঝড় যেখানে নিত্যসঙ্গী, সেখানে মানুষের একমাত্র আশ্রয়স্থলটিও এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। গতকাল শনিবার গোবিন্দপুর গাজী আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজের জরাজীর্ণ ভবনের সামনের অংশ ধসে পড়েছে। ভবনটি অনেক আগেই ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বিকল্প না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই সেখানে চলছে পাঠদান।

ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের ধারাবাহিক প্রভাবে দেশের উপকূলীয় জনপদ কয়রা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই দুর্যোগের প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। কয়রা উপজেলার গাজী আব্দুল জব্বার হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা ও দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে বিদ্যালয় চত্বরে পানি জমে যায়। ঘূর্ণিঝড় ও প্রবল বাতাসের সময় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। দুর্যোগকালীন সময়ে নিরাপদ শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করতে অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

অভিভাবকদের অভিযোগ, উপকূলীয় এলাকার বাস্তবতা বিবেচনায় বিদ্যালয়গুলোর জন্য দুর্যোগ-সহনশীল ভবন, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং জরুরি আশ্রয় সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে কয়রার মতো দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ রাখা সময়ের দাবি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার গোবিন্দপুর, আটরা, দশহালিয়া ও লোকা এলাকাগুলো এখন জলবায়ু পরিবর্তনের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। কপোতাক্ষ নদের পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই জনপদে নদীভাঙন আর জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে মানুষের জীবন আজ লন্ডভন্ড। বিগত পাঁচ বছরে অন্তত ৭০টি পরিবার তাদের ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। অথচ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মাথা গোঁজার মতো নেই কোনো আশ্রয়কেন্দ্র। এলাকায় গোবিন্দপুর গাজী আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজই একমাত্র বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দুর্যোগের সময় এলাকাবাসী এখানেই আশ্রয় নেয়। অথচ দুইতলা এই ভবনটি বর্তমানে কঙ্কালসার। দরজা-জানালা নেই, ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। এই জরাজীর্ণ কক্ষগুলোতেই শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে। কিন্তু গতকাল হঠাৎ ভবনের সামনের অংশ ভেঙে যায়। স্কুল ছুটি থাকায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

প্রতিষ্ঠানের প্রভাষক রবিউল ইসলাম বলেন, এ এলাকায় তিন কিলোমিটারের মধ্যে কোনো সাইক্লোন শেল্টার নেই। জলোচ্ছ্বাসের সময় মানুষকে নিরুপায় হয়ে গাছে উঠে আশ্রয় নিতেও দেখেছি আমরা। স্কুলটি জরাজীর্ণ হলেও দুর্যোগে মানুষের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না। কিন্তু ভবনটি ভেঙে যাওয়ায় এখন ছাত্র ছাত্রীদের ক্লাস নেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ।

এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মাওলানা মহিববুল্যাহ নিজের অসহায়ত্বের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, নদী প্রতিদিন আমাদের গ্রাম খেয়ে ফেলছে। গত ৫ বছরে সব শেষ হয়ে গেছে। ঝড় হলে কিংবা বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হলে আমরা কোথায় যামু? আমাদের দেখার কেউ নেই। এই করুণ প্রশ্নটিই এখন গোটা এলাকার নিম্নবিত্ত মানুষের মুখে মুখে।

উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর সাইক্লোন সিজনে উপকূলের খবর শিরোনাম হয়, কিছু ত্রাণ আর সহানুভূতি দেখা যায়। কিন্তু টেকসই সমাধানে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। কপোতাক্ষের জরাজীর্ণ বাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব এই এলাকার মানুষকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এখানে জরুরি ভিত্তিতে একটি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি।

কয়রা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, আমরা জানি ওই এলাকায় একটি সুপরিকল্পিত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা কতটা জরুরি। গাজী আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে একটি আধুনিক সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের প্রস্তাবনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করব।

অস্থায়ী সংস্কার বা ত্রাণ নয়, গোবিন্দপুর ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষায় একটি নিরাপদ ও কার্যকর আশ্রয়কেন্দ্র এখন প্রাণের দাবি।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন